1. news.rifan@gmail.com : admin :
  2. smborhan.elite@gmail.com : Borhan Uddin : Borhan Uddin
  3. arroy2103777@gmail.com : Amrito Roy : Amrito Roy
  4. holysiamsrabon@gmail.com : Siam Srabon : Siam Srabon
বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ১১:৫০ অপরাহ্ন




যশোর সরকারি হাসপাতাল ঘিরে জমজমাট ক্লিনিক ব্যবসা

  • সর্বশেষ পরিমার্জন: শনিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৩
  • ২৪৭ বার পঠিত

রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা, ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্রোপচার ও ভুল চিকিৎসায় বাড়ছে মৃত্যু

জেমস আব্দুর রহিম রানা : সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ নজরে না পড়লেও যশোরের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। ফলে, দিন দিন জমজমাট হয়ে উঠছে যশোরে ক্লিনিক ব্যবসা। বর্তমানে যশোরে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিকের সংখ্যা ৩শ’১৮টি। এর মধ্যে ক্লিনিক ও হাসপাতাল রয়েছে ১শ’৭৮টি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১শ’৩৮টি। এসব ক্লিনিকের শতকরা ৪৫ ভাগেরই বৈধ লাইসেন্স নেই। নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্সসহ আসবাবপত্র। তারপরও এসব ক্লিনিকের সামনে ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা এখানে রোগীদের সব ধরনের অপারেশন করা হয়’ এমন সাইন বোর্ড টাঙানো রয়েছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, লাইসেন্স ঠিক রাখার জন্যে কাগজে-কলমে এ তালিকা ঠিক থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই তা নেই। ইউনিক হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হাসপাতাল, সেন্ট্রাল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক, কমটেক হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যশোর আধুনিক হাসপাতাল, লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সততা ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ অধিকাংশ ক্লিনিকেই নেই কোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসক। অথচ ক্লিনিকের সামনে বড় বড় ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে। এসব সাইনবোর্ড দেখে রোগীরা ক্লিনিকে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছে। বেশিরভাগ সময় ‘আনাড়ি চিকিৎসক’ দিয়েই চলছে চিকিৎসাসেবা।

যেকারণে যশোর শহরের বেসরকারি হসপিটাল ও ক্লিনিকে ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা অবহেলায় রোগী মারা যাচ্ছে। এমনিভাবে গত কয়েকমাসে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন যশোর সদর উপজেলার মুনসেফপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মৃত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে রুনা বেগম (২৬), মুড়লি মোড়ের জোড়া মন্দির এলাকার বিপ্লব হোসেনের ছেলে ইরহাম (৪১ দিন), চাঁচড়া মধ্যপাড়ার রবিউল ইসলামের মেয়ে মীম খাতুন (১২), চাঁচড়া মধ্যপাড়ার রবিউল ইসলামের মেয়ে মীম খাতুন (১২), ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা ইউনিয়নের বামন আলী চাপাতলা গ্রামের ড্রাইভার গোলাম রসুলের স্ত্রী আসমা বেগম (৩২) ও মণিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তার মিস্ত্রির ছেলে আব্দুল মান্নান (৪০)। এছাড়া অপচিকিৎসা ও প্যাথলজি পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্মের কিছু দিন পর যশোর শহরের বেসরকারি একটি হসপিটালে পায়ুপথে অস্ত্রোপচার করা হয় ইরহামের। সেই থেকে অসুস্থ ছিলো শিশুটি। ১ নভেম্বর বুধবার বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে ইরহামের শরীরে একটি ইনজেকশন পুশ করা হয়। কিছু সময় পর তার শরীর নীল রঙের হয়ে যায়। দুপুর ২ টার দিকে মৃত্যু হয় ইরহামের। স্বজনদের অভিযোগ ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেছে। গত ২৯ অক্টোবর রুনা কানের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হন একটি বেসরকারি হসপিটালে। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক অধ্যাপক ডাক্তার আবুু কায়সার ৩৫ হাজার টাকার চুক্তিতে রোগীর অপারেশন করেন। পরে রাতে তিনি ঢাকায় চলে যান। ফলে কাঙ্খিত চিকিৎসাসেবা মেলেনি। অপারেশন পরবর্তী চিকিৎসা না পেয়ে মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে রুনার মৃত্যু হয়। টনসিলের সমস্যা নিয়ে মীমকে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনে একটি হসপিটালে ভর্তি করা হয়। অপারেশনের পরের দিন সকালে মারা যায় মীম। স্বজনদের অভিযোগ, ইনজেকশন পুশ করার কয়েকদিন মিনিট পরেই মীমের মৃতু হয়। আব্দুল মান্নান। পায়ে হেটে একটি বেসরকারি হসপিটালে এসে ফিরেছেন লাশ হয়ে। অস্ত্রোপচার টেবিলেই তিনি মারা যান। ওই সময় স্বজনদের অভিযোগ ছিলো অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক ছাড়াই রোগীকে অজ্ঞান করার কারণে তার মৃত্যু হয়। আর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে একটি হসপিটালে ভর্তি হয়েছিলেন মইফুল বেগম। জরুরি বিভাগ থেকে একটি ইনজেকশ পুশ করার সাথেই মারা যান মইফুল। এছাড়া ত্রæটিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যু হয় আসমা বেগমের।

সূত্র জানায়, যশোর শহরে সরকারের নির্দেশনা না মেনে নিজেদের ইচ্ছামতো হসপিটাল ও ক্লিনিক গড়ে বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে একটি মহল। না বুঝে মানুষ সেখানে চিকিৎসার জন্য গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। একাধিক নামমাত্র বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবায় ঝুঁকির আশংকা রয়েছে। আর এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার জন্য এসে মাশুল গুনতে হচ্ছে রোগী স্বজনদের। চিকিৎসাসেবা নামে প্রতারণা করা যেনো মালিক পক্ষের লক্ষ্য। দালাল নির্ভর অধিকাংশ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান মালিকদের উদ্দেশ্য যেনতেন চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে কাড়ি কাড়ি টাকা কামানো। অথচ মানসম্মত অপারেশন থিয়েটার (ওটি) রোগ নির্ণয়ের জন্য উন্নতমানের কোন যন্ত্রপাতি নেই। আবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা হলেও মুহুর্তে ফের কার্যক্রম চালু হয়ে যায়। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে তদারকি ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা না থাকার কারণে অসাধুরা অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠান চালু করার সাহস দেখাচ্ছেন। গত ৩ অক্টোবর যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীর আবু মাউদের নেতৃত্বে কয়েকটি হসপিটাল- ক্লিনিকে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় আল হায়াত হাসপাতাল এন্ড ডায়াগন্টিক সেন্টার, সিটি হাসপাতাল এন্ড ডায়াগন্টিক সেন্টার, যশোর আই কেয়ার এন্ড লেজার সেন্টার, সিটি হাসপাতাল ফার্মেসী ও আল হায়াত ফার্মেসীসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন।

ঘোপ সেন্ট্রাল রোডে অবস্থিত সিটি হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবার নামে প্রতারণার অভিযোগ ছিলো। কনসালটেন্ট চিকিৎসক ছাড়াই রোগীদের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কাড়ি কাড়ি টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছিলো। অভিযানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় সেখানকার প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যশোর আই কেয়ার এন্ড লেজার সেন্টারে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে চিকিৎসা প্রতারণা করা হচ্ছিলো। বৈধ কাগজপত্র নেই প্রতিষ্ঠানটির।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস জানান, ১৯৮২ সালের দ্য মেডিকেল প্রাকটিস অ্যান্ড প্রইিভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্সেই উল্লেখ আছে, ১০ শয্যার প্রতিটি হাসপাতাল অথবা ক্লিনিকে রোগী প্রতি ফ্লোর স্পেস থাকতে হবে নূন্যতম ৮০ বর্গফুট। জরুরি বিভাগ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকিমুক্ত অপারেশন থিয়েটার, চিকিৎসার জন্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি থাকতে হবে।
তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিকে ১০ বেডের জন্যে তিনজন চিকিৎসক (সকাল, বিকেল ও রাতে প্রতি শিফট-এ ১ জন করে), ছয়জন ডিপ্লোমা নার্স, তিনজন ওয়ার্ড বয় ও তিনজন আয়া, ৩ জন সুইপার ও ৮শ’ বর্গফুট জায়গা থাকা বাধ্যতামূলক। নামমাত্র এসব হসপিটাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়া বন্ধ করা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম শুরু করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কোন হাসপাতাল ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা পরিচালনার সুযোগ দেয়া হবে না। ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনেরা অভিযোগ করলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আরও খবর...