1. news.rifan@gmail.com : admin :
  2. smborhan.elite@gmail.com : Borhan Uddin : Borhan Uddin
  3. arroy2103777@gmail.com : Amrito Roy : Amrito Roy
  4. hmgkrnoor@gmail.com : Golam Kibriya : Golam Kibriya
  5. mdmohaiminul77@gmail.com : Md Mohaiminul : Md Mohaiminul
  6. ripon11vai@gmail.com : Ripon : Ripon
  7. holysiamsrabon@gmail.com : Siam Srabon : Siam Srabon
বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :




তৃতীয় পৃথিবীতে (পর্ব-০২) by সালমান পারভেজ সবুজ

  • সর্বশেষ পরিমার্জন: বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
  • ২২৯ বার পঠিত

সালমান পারভেজ সবুজ : আসছে শুক্রবার তারা হিলি বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। বাধ সাধে অফিসের ম্যানেজার। তিনি ফোন করে জানালেন,জরুরি কাজ আছেএই শনিবার তাকে অফিসে আসতে হবে। সামনে ডিসেম্বর ক্লোজিং, জমানো ফাইলগুলো দ্রুত রিলিজ করতে হবে। শনিবার কাজ করে এগিয়ে নিতে হবে। শুনে রোহানের শরীর যেন রাগে একেবারে জ্বলে ওঠে। সে কোনো কথা বলে না। আগে সে শুক্রবার শনিবারও কাজ করেছে। তখনকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল, তখন সে একা ছিল, এখন তো তার পরিবার হয়েছে, ইচ্ছে করলেই সবকিছু তো এখন করা সম্ভব নয়। তিনি কীভাবে এমন কথা বলেন রোহান বুঝে উঠতে পারে না। রাগে-ক্ষোভে তার রক্ত যেন ফিনকি দিয়ে উঠছে। তার অস্থিরতা দেখে বর্ণা জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে, কোনো সমস্যা?
-না।
-তাহলে?
-তাহলে আর কী? শোননি, এই রাতে ইকরাম সাহেব ফোন করেছে শনিবার অফিস করতে হবে।
-শনিবার ছুটি না?
-হুম।
-তো, তুমি যাবা না। দেখি কী করে ওই বেটা।

রোহান কোনো কথা বলে না। এই ইকরাম হোসেন এখানে দায়িত্ব নিয়ে আসার পরেই রোহানের যত জ¦ালা হয়েছে। সে নরম মনের মানুষ, অন্য অফিসারের মতো মুখের উপরে ‘না’ বলতে পারে না। এটাই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতদিন ব্যাচেলর ছিল, সবই সে নীরবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু এখন সে আর মেনে নিতে পারে না।
অফিসের কেউ-ই এই ইকরাম হোসেনকে পছন্দ করে না। পিয়ন থেকে শুরু করে অফিসার পর্যন্ত কেউ-ই না। এমনকি গ্রাহকদের মধ্যে অনেকেই তাঁর ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কিন্তু ইকরাম হোসেন কোনোকিছুকেই পাত্তা দেন না। তিনি নিজের হিসেব নিজে কষেই চলেন। অন্য কেউ-ই তাঁর হিসেবে শামিল হতে পারে না, এমনকি তিনি তা করতেও দেন না। তিনি অনেকটা একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে চলেন।
প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে তাঁর সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে তিনি অন্য একটি প্রভাব বলয়ে থাকেন। তিনি দীর্ঘদিনের চাকুরি-জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এমন দায়িত্ব পাওয়ায় তাঁর মধ্যে এক ধরনের দাম্ভিকতাও কাজ করে। নিজেকে প্রমাণ করার তাড়নায় তিনি সর্বদা তাড়িত থাকেন। একটা অস্থিরতা তাঁর মধ্যে কাজ করে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ চাকুরি-জীবনে তাঁর উপরে অনেক অবিচার করা হয়েছে। তাঁকে যথার্থ মূল্যায়নও করা হয়নি। তাই তিনি নিজেকে প্রমাণ করে দেখাতে মরিয়া হয়ে দৌড়ে বেড়ান।
ইকরাম সাহেবের স্ত্রীও এখন দলীয়ভাবে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। সামনে উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। মনোনয়ন পেলেই তিনি চেয়ারম্যান। এমপি মহোদয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও খুব ভালো। ইকরাম সাহেবও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে গর্ব করেন। বলেন, তোমার ভাবি স্বল্প সময়ে কত ভালো পজিশনে উঠে গেছে। সামনে জেলা সম্মেলনে সে দলের সেক্রেটারি পদের জন্য লড়বে, দেখ হয়েই যাবে। এমপি সাহেবের সঙ্গে তো আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রায়ই আমাদের বাসায় আসেন।
মূলত স্ত্রীর বলে বলীয়ান হয়েই তিনি নিজেকে এতটা জাহির করেন। সেটা ওপেন সিক্রেটের মতোই সকলের জানা। আর রাজনীতিতে তাঁর স্ত্রীর এত দ্রুত উঠে আসার কারণ এমপি মহোদয়ের সঙ্গে সম্পর্ক। তবে ইকরাম সাহেব যে পারিবারিক সম্পর্কের কথা বলেছেন, তা সত্য নয়। এটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এমপি মহোদয়ের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর একান্তই ব্যক্তিগত। রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি বেশ আলোচিত, সেটা ইকরাম সাহেব নিজেও জানেন।
অবশ্যই তিনি এ অফিসে আসার পরে অনেক পরিবর্তন এনেছেন। তাঁর একটি কথা রোহানের ভালো লাগে, ‘কাজ কখনো তৈরি থাকে না, কাজকে তৈরি করে নিতে হয়’। তিনি আসার পর কাজের গতিও বেড়েছে। তাঁর তৎপরতায় অফিসের পরিবেশেও এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সবকিছুই ম্লান হয়ে যায় তার ব্যবহারের অতি আদিখ্যেতার জন্য। যে কারণে কেউ তাঁকে পছন্দ করে না। তাঁর ভাবখানায় মনে হয়, অফিসটা তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি। ইকরাম হোসেন সেটা ভাবতেই পারেন। তিনি অনেক সংগ্রাম করে আজকের এই পর্যায়ে এসেছেন।
তাঁর পৈত্রিক নিবাস গাইবান্ধার সরিষাবাড়ি। সেখানে তাঁর মা ও ভাই থাকেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু কথা একদিন তিনি রোহানকে বলেছিলেন। তাঁদের জমিজমা বিষয়-সম্পত্তিও ছিল। কিন্তু তাঁর বাবা জুয়া খেলে সব শেষ করে ফেলেন। অভাবের সংসারে তিনি ভাগ্যের খোঁজে বাড়ি ছাড়েন চল্লিশ বছর আগে। ঘুরতে ঘুরতে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে নওগাঁ শহরে তাঁর জায়গা হয়। জায়গির হিসাবে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে তাঁর জায়গা হয়, এতে তিনি পড়শোনা চালিয়ে নিতে সক্ষম হন। অত্যন্ত চৌকশ ও স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ায় সেই ব্যবসায়ীর নজরে পড়েন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজও জুটে যায়।
সেই থেকে তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। সেই জায়গির থাকা ইকরাম হোসেন যে আজ সেই শহরের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান। এটা একাদশের বৃহস্পতিতে আজ চাঁদের হাটে বসে গ্লানিতে পরাস্ত অতীতকে চোখ টাটানোর মতোই তাঁর কাছে গৌরবদীপ্ত আরকি। এই আত্মতৃপ্তি অবশ্যই তাঁর কাছে সোনার হরিণ জয়ের থেকেও ঢের বেশি।
-সে দেখা যাবে, তুমি খাওয়ার ব্যবস্থা কর।
-আমরা কি তাহলে যাচ্ছি না?
-ইচ্ছে তো আছে।
-তুমি একটু কোক আনতে পারবে, যে মাংস রান্না হয়েছে তাতে একটু কোক হলে বেশ মজাই হতো।
-দেখছি, তুমি খাবার রেডি কর।
বৃহস্পতিবার আসলেই বর্ণার মধ্যে অন্যরকম এক উৎসাহ কাজ করে। বিশেষ করে যখন তার মন ভালো থাকে। বিষয়টি রোহানও বেশ উপভোগ করে। প্রতি বৃহস্পতিবার অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে তারা বেরিয়ে পড়ে। রিকশায় করে ঘুরে-ফিরে ফুচকা-চটপটি খাওয়া, মুক্তির মোড়ে হাসিমের স্পেশাল চা খাওয়া, ফেরার পথে টুকটাক বাজার করাÑসবই তারা এনজয় করে। রাতে খাওয়া দাওয়া করে তারা টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে।
দুদিন ছুটি অনেকটা ইদ-আনন্দের অনুভূতি কাজ করে তাদের মধ্যে। পরদিন সকালে উঠে তারা বেরিয়ে পড়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘোরাফেরাও হয়, বাইরে খাওয়া-দাওয়াও হয়। বিয়ের পরে প্রথম প্রথম তো প্রতিটি শুক্র-শনিবার এক-একটি মিনিট্যুর হয়ে যেত। বর্ষায় তালতলী বিলের নৌকাভ্রমণ, বিল পেরিয়ে খোলা মাঠে পিকনিক করা, এসবই অনন্য এক আবেদন বহন করে।
রোহান কী করবে বুঝতে পারছে না। কেননা তাদের ইচ্ছে, দিনাজপুরে একদিন থাকবে, ঘুরে-ফিরে সব দেখে পরদিন ফিরবে। শনিবার অফিস করতে হলে সে গুড়ে তো বালি।
তার সিগারেটও শেষ, আজ ফেরার সময় আনা হয়নি। রোহান একটি গেঞ্জি গায়ে জড়িয়ে নিচে নামে। চকদেব পুকুরপাড় ধরে বামে একটু মোড় নিলেই একটি মুদির দোকান। মোটামুটি প্রয়োজনীয় সবই এখানে পাওয়া যায়। দোকানটি একটি পুরাতন বাড়ির নিচতলায় অবস্থিত। দোকানটি চালায় বয়স্ক এক খালা, পারুল খালা। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাঝেমধ্যে তার মেয়েও দোকানে বসে। মা-মেয়ে এ বাড়িতে থাকে। খালার পাঁচ বছরের একটি নাতিনও রয়েছে। মেয়ের সাথে জামাইয়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মেয়ে-জামাই পেশায় উকিল ছিল। নেশা-বানে সবই খুইয়ে ফেলে। মেয়ের উপরে দিনদিন অত্যাচার বাড়তে থাকায় খালা মেয়েকে ছাড়িয়ে নেয়। মেয়েটি তার বাচ্চাকে নিয়ে খালার কাছে থাকে।
খালার একমাত্র ছেলে এ বাড়িতে থাকে না, সে বগুড়াতে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরি করে। সে বউ নিয়ে সেখানেই থাকে। খালার মনে অনেক কষ্ট। মেয়েটারে ফেলতেও পারে না, সে বাচ্চাটা নিয়ে কোথায় আর যাবে! ছেলের বউ তার মেয়ে-নাতিনকে সহ্য করতে পারে না। তাই খালা ছেলেকে পরামার্শ দিয়েছে বউ নিয়ে আলাদা থাকার জন্য। ছেলেটি মাঝেমধ্যে খালাকে দেখতে আসে। অবশ্য বাড়িটা খালু তার নামে লিখে দিয়েছিল, সে জেরেই এখানে থাকতে পারছে বলে খালা বিশ্বাস করে।
ভিন্ন মাত্রা হচ্ছে, খালার বাড়ির তিনটি বাড়ির পরে মোমিনের বাড়ি। মোমিন একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত ড্রাইভার। তিনি শধু ব্যাংকের চেয়ারম্যানই নন, সরকারদলীয় গুরুত্বপূর্ণ বড় নেতা। যে কারণে বড় বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ঠিকাদার, রাজনৈতিক নেতাসহ অনেকেই তাকে তোয়াজ করে, তাকে সমীহ করে। এমনকি এই দলে সরকারের বড় বড় কর্মকর্তাও রয়েছেন। সব মিলিয়ে তার ভালোই দেন-দরবার হয়। যত সেটেলমেন্ট তত হাদিয়া।
তার পদবি ড্রাইভার হলেও তার আভিজাত্য বলে ভিন্ন কথা। যে আলিশান বাড়িতে সে বসবাস করে, তা একজন ড্রাইভারের সাথে যায় না। শহরের প্রাইম লোকেশনে চারতলা বাড়ির যে জৌলুস ফুটে বের হয়, তা দেখলে যে-কেউ ভুল করবে তার কর্ম নিয়ে। অবশ্যই তাতে মোমিনের কিছু যায় আসে না। পয়সাই সবকিছু।
সে শুধুই চেয়ারম্যান সাহেবের ড্রাইভার নয়, সাথে অনেকেরই স্বপ্নকে সে ড্রাইভ করে। সে ড্রাইভার হলেও তার হাত ধরে অনেকেই চাকুরি নামক সোনার হরিণ জিতেছেন এবং স্বপ্নের ডানায় ভর করে উড়ে উড়ে বেড়িয়েছেন। তার সুদৃষ্টিতে অনেকেই গ্লানির সাগর পাড়ি দিয়ে, দৈন্যতার বেড়াজাল ভেঙে, কষ্টের শিকল ছিঁড়ে জীর্ণজীবন থেকে মুক্তি পেয়েছেন, পেয়েছেন মুঠোভরা সোনালি স্বপ্নের রোদ্দুর। অনেকে আবার তার হাত ধরে প্রমোশন নিয়েছেন, বড়কর্তা বনেও গেছেন।
রোহানও একবার গিয়েছিল তার বাড়িতে বাসা দেখার জন্য। বাড়িতে অনেক খরচা করেছেন। নান্দনিক রুচির বাহারি সব আসবাব, ঝাড়বাতি, দরজার বাহারি ডিজাইন যেন হাতছানি দিয়ে ডেকে ডেকে আভিজাত্যের কথা বলতে চায়। তার মেয়েটা ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করেছিল। কিন্ত বিধিবাম হওয়ায় তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মেয়েটি বখে গিয়েছিল, নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছিল। উপায়ান্তর না পেয়ে তার মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসে। এখানে স্কুলে ভর্তি করে দেয়। ছেলেটি একটু বোকা ধাঁচের, তার মধ্যে এডিএইচডির কিছু লক্ষণ দেখা যায়।
মোমিন কর্মে যা-ই করুক না কেন, ধর্মে তার নামের স্বার্থকতা রেখেছেন। সাদা পাজামার সাথে সাদা শুভ্র দাড়িতে তাকে বেশ মানায়। দু’হাতে দান-খয়রাত করা, মসজিদ মাদরাসায় অনুদান দেওয়াসহ সব কিছুতেই সে সমানে আছে। দিল তার দরিয়ার মতোই উদার। একেবারে কেতাদুরস্ত এক খয়েরখাঁ। তার বিশ^াস, আল্লাহর ইচ্ছে ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। আল্লাহ চেয়েছেন বলেই তো তার দ্বারা সবই করাচ্ছেন।
মাছের তেলে মাছ ভাজতে তো তার সমস্যা থাকার কথা নয়। কোন মাছের তেলে কোন মাছের ভাজি হচ্ছে, আর কে বা কারা খাচ্ছেÑতা নিয়ে সে মাথা ঘামাতে চায় না। হাত কচলাতে কচলাতে বেমালুম পিছনে চলে যায়। এসব নিয়ে তার মনে কোনো ভাবনা নেই। লোকে মাঝেমধ্যে দুএকটা কথা শোনাতেও ছাড়ে না। এতে তার সহজ-সরল স্বীকার উক্তি, ‘আমি তো মানুষের উপকারই করি, মানুষ খুশি হয়েই আমাকে কিছু হাদিয়া দিয়ে থাকেন’।
মোমিনরা দু’ভাই। তার ছোট ভাই মতিন। মতিন আর তার বাড়ি পাশাপাশি। মোমিনের বাড়ির লাগোয়া মতিনের টিন-সেটের বাড়ি। চারতলা বাড়ির সাথে টিন-সেটের বাড়িটা দেখলে মনে হয় এ বাড়ির কাজের লোকের থাকার ঘর। মতিন সাহেবের প্রেমের বিয়ে। তার বউ একটি স্কুলের শিক্ষকতা করেন। বয়স পঁয়ত্রিশ পেরুলেও শরীরিক গঠন দেখে মনে হয় পঁচিশের কোঠায়। এখনো কোন বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি। কোনো ব্যক্তি প্রথমবার তাকে দেখলে দ্বিতীয়বার আবার দেখার সুযোগ খুঁজবে। যদি সে যুবক শিক্ষিত হয়ে থাকে, তবে বৈধতা নেওয়ার জন্য নজরুলের সুরে গাইবে, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি, প্রিয় সে কি আমার অপরাধ! তাছাড়া হয়তো বলবে, মাইরি, মাল একখান। শুধু যুবকই নয়, যে-কোনো পুরুষ তাকে মনেপ্রাণে কাছে পাবার বাসনা লালন করবে, এলাকার কতজন তার কথা ভেবে বিছানা ভিজায় তার হিসেব কে রাখে!
ব্যক্তিজীবনে মতিন সাহেব অত্যন্ত জীবন-বিমুখ একজন সাদাসিধে মানুষ। কর্মজীবনে আমড়া কাঠের মতোই অসাড় বেকার। লুঙ্গি পরে গায়ে ঢোলাঢালা একখানা শার্ট ঝুলিয়ে তাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। অসঙ্গত কারণে মতিন সাহেব মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করেও তাকে ফেরানো যায়নি। তার স্ত্রীর সাথে চাচির ছেলের দেহ-মনের বেহিসেবি দেনা-পাওনার হিসেব চুকাতে গিয়েই খালার ছেলেকে এলাকা ছাড়তে হয়েছে।
রোহান দোকান থেকে একটি কোকের বোতল, এক প্যাকেট চানাচুর আর কয়েকটি সিগারেট নিয়ে বাসায় ফেরে। চানাচুরের প্যাকেট দেখে বর্ণা খুশি হয়, রাতে টিভি দেখতে দেখতে খাওয়া যাবে। তারা রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে টিভি দেখতে বসে। একটি ব্যাগও গুছিয়ে রাখে। সকালে নাস্তা করেই বেরিয়ে পড়বে।
প্রচণ্ড শীত পড়ছে। তাদের ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়। কাজের খালাও সকালে আসতে দেরি করেছে। তারা উঠে রিকশা-যোগে হিমহিম শীতের মধ্যে বেরিয়ে পড়ে। টার্মিনালে গিয়ে নুরু চাচার হোটেলে ঢোকে। এখানকার হাঁসের মাংস আর আটার রুটির স্বাদই আলাদা। যে একবার খেয়েছে, সুযোগ পেলে সে আরেকবার না খেয়ে ছাড়বে না। হোটেলের পরিবেশটা সাদামাটা হলেওপরিষ্কারপরিচ্ছন্নতার জন্য খেতে অরুচি আসে না। অনেক ভদ্র মশাই এখানে আসেন হাঁসের ঝাল-মাংস আর আটার রুটি খেতে। রীতিমতো সিরিয়াল লেগেই থাকে। তারা সকালের নাস্তা সেরে চা খেয়ে বগুড়ার গাড়িতে ওঠে।
বর্ণার ঠান্ডা বেশি। তার কোল্ড এলার্জিও আছে। প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকায় সে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে, পৌষের দ্বিতীয় দিন। কথায় আছে, পৌষের শীত মহিষের গায়। বর্ণার বেগতিক ভাব দেখে কিছুটা অনুধাবন করা যায় যে, দুস্থদের কী অবস্থা হতে পারে। গাড়ি ছাড়ার পরে বাতাসে শীতের মাত্রা আরও বেড়ে যায়, বর্ণা নাকমুখ আটকে বসলেও তার নাক দিয়ে পানি ঝরতে শুরু করে।
যে শীত পড়ছে, তাতে হিলি গেলে বর্ণার হিল্লে হবে বেহাল। তারা বগুড়ার চৌরাস্তায় নেমে চা খেয়ে সোজা চলে যায় মহাস্থানগড়ে। বগুড়া থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর তীর ঘেঁষে মহাস্থানগড় অবস্থিত। প্রাচীন ঐতিহ্যেবেষ্টিত এই নগরীর ভেতর রয়েছে বিভিন্ন আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এটি মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ২,৫০০ বছর আগে গড়ে ওঠা এই স্থানটি বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। চীন ও তিব্বত থেকে অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এখানে লেখাপড়ার জন্য আসতেন। এরপর তারা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্নদেশে ছড়িয়ে পড়তেন শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে। স্থানটি সম্পর্কে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে লিখে গেছেন।
তবে পরিতাপের বিষয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিচারে এ মহাস্থানগড়ের গুরুত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা সরকার আদৌও বুঝেছে বলে মনে হয় না। যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক থেকে নেমে মহাস্থানগড়ের মিউজিয়াম পর্যন্ত বিদ্যমান সড়ক-ব্যবস্থার দৈন্যদশা, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। পর্যটকদের আনাগোনা এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে কোনো খামতি চোখে পড়ে না। জায়গাটাকে যদি একটু সাজিয়ে গুছিয়ে, সড়ক-ব্যবস্থার বেহাল দশার পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যেত, তাহলে ছবির মতোই অপরূপ লাগত। আশপাশের দোকান-পাট, যাতায়াতের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ও পরিপাটির মধ্যে যে হীনতা গদগদ করে উগরাচ্ছে, তা যে কোনো রুচিসম্মত ভ্রমণপিপাসুকে বিরক্তির উদ্গিরণে ভাসিয়ে তাঁর ভ্রমণের উৎসাহকে তলানিতে নিয়ে ঠেকাবে।
টিকিট করে তারা প্রথমে মিউজিয়ামে ঢুকে ঘুরে ফিরে সবই দেখে। না, ভিতরের পরিবেশটা মোটামুটি মানসম্মত। আসতে যে পরিমাণ ধকল গেছে, তা যেন একটু পুষিয়ে গেল। ভিতরে দর্শনার্থীদের যথেষ্ট ভিড় আছে। এটি ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মহাস্থানগড় খনন করে প্রাপ্ত মূল্যবান জিনিসপত্র এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবতার মূর্তি, বিভিন্ন যুগের মুদ্রা, স্মারকলিপি, শিলালিপি, আত্মরক্ষার অস্ত্রসহ ব্যবহৃত মূল্যবান বিভিন্ন ধাতব-সামগ্রী। রোহানের কাছে ইতিহাসকে খুব নির্মম মনে হলো। এখানকার মিউজিয়ামের প্রত্যেকটি উপাদান যেন এক একটি জীবন্ত অধ্যায়। তারা যেন বড্ড অভিমানে বলতে চাইছে, আমরা ইতিহসের ধারক তোমরা ইতিহাসের বাহক। এই ধারক-বাহকের সম্পর্কই অনন্য এক সভ্যতা বিনির্মাণে অনবদ্য উপাদান হতে পারে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন গৌড়ের রাজা থাকার সময়ে এই গড় অরক্ষিত হয়ে পড়ে। সে সময়ে মহাস্থানগড়ের রাজা নীলের সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের বিরোধ লেগেই থাকত। এক অভিশপ্ত ব্রাহ্মণ তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে একই সময়ে ভারতের দাক্ষিণাত্যের শ্রীক্ষেত্রথেকে এখানে আসেন। তিনি পরশু বা কুঠার দিয়ে নিজের মাকে হত্যার দায়ে অভিশপ্ত ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি এই দুই ভাইয়ের বিরোধ মেটানোর নাম করে কৌশলে নিজেই রাজা বনে যান। ইতিহাসে তিনি পরশুরাম হিসেবে পরিচিতি পান।
রাজা হওয়ার পর তিনি অত্যাচারী শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার অত্যাচারে যখন এলাকার জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে ইসলাম ধর্মের প্রচারকগণ; ইরান, আরব, আফগানসহ বিভিন্নস্থান থেকে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে এতদাঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে আসেন। এদেরই একজন ফকির বেশি দরবেশ হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখি রহ. ও তাঁর শিষ্যগণ আফগানিস্তান থেকে এখানে এসেছিলেন।
ধর্মপ্রচারক শাহ্ সুলতান বলখি র. সম্পর্কে চটকদার এক কিংবদন্তি বয়ান আছে, যা বেহুলার বাসরঘরের থেকেও কমতি নয়। অবশ্য না থাকাটাই অস্বাভাবিক বরং থাকাটাই স্বাভাবিক এবং স্বভাবজাত। তিনি না-কি প্রাচীন পুণ্ড্রনগরে প্রবেশ করার সময়ে করতোয়া নদী পার হয়েছিলেন একটা বিশাল মাছের পিঠে চড়ে। এ কারণে তাকে মাহিসাওয়ার অর্থাৎ, মাছের পিঠে করে আগমণকারী বলা হয়। মহাস্থানগড়ে পৌঁছে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। রাজা পরশুরামের সেনাপ্রধান, মন্ত্রী ও সাধারণ মানুষের একটি অংশ ইসলামের শান্তির বাণীতে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে যান।
এভাবে পুণ্ড্রবর্ধনের মানুষ হিন্দু-ধর্ম থেকে ইসলাম-ধর্ম গ্রহণ করতে থাকলে রাজা পরশুরামের সাথে শাহ সুলতানের বিরোধ হলে কোনো এক সময় ১২০৫-১২২০ মতান্তরে ১৩৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তাদের মাঝে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পরশুরাম পরাজিত এবং নিহত হন। পরশুরামের মৃত্যুর পরে শীলাদেবী, পরশুরামের বোন মতান্তরে তাঁর মেয়ে অর্থাৎ রাজকন্যা, করতোয়া নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেন। তাঁর ডুবে যাওয়ার স্থানটি শীলাদেবীর ঘাট হিসাবে পরিচিত, যেখানে প্রতি বছর হিন্দুদের স্নান হয় এবং একদিনের একটি মেলা বসে।
মিউজিয়ামের পরেই কালীদহ সাগর, শীলাদেবীর ঘাট, জিউৎকুন্ড ও বেহুলার বাসরঘর এখানকার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। তারা শীলাদেবীর ঘাটে এসে বসে। দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত এলাকাটি, বিশেষ করে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের আনাগোনা বেশি।
Ñজানো, কোথাও বেড়াতে গেলে বা কেউ বেড়াতে এলেও সবাই কেন যেন মেয়েদের দিকেই দেখে। বুঝিনা, সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, মেয়েদের দিকেই সবার চোখ থাকে। কারণ কী?
মেয়েরা জন্মগতভাবেই একটু ঈর্ষাপরায়ণ যা আবেগ তাড়িত, তারা হৃদয়ের অর্ন্তদাহ থেকেই মেয়েদের দিকে দেখে। আর ছেলেরা দেখে এটা তাদের সহজাত প্রবণতা। রোহান মৃদ হাসে, কোনো উত্তর দেয় না। সে জানে উত্তরটা বর্ণার পছন্দ হবার নয়। এসবের কিছুই তার মাথায় ঢুকবে না, বরং তার মেজাজটা বিগড়ে যাবে।
-কিছু খাবে?
ঠোঁট বাঁকিয়ে বর্ণা না-সূচক ইঙ্গিত দেয়।
-ঠান্ডা কিছু খেলে ভালো লাগত মনে হয়, বলেই বর্ণার দিকে হাসে রোহান।
-হুম, চল।
রোহান উঠে দাঁড়িয়ে বর্ণার দিকে হাতটা বাড়ায়, বর্ণা তার হাত ধরে উঠতে গিয়ে পড়ে যায়, রোহানও তার উপরে পড়ে যায়। এটা দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি বাচ্চাদের মধ্যে একটি বাচ্চা ছেলে হাতে মুখ চেপে ফিক করে হেসে দেয়।
-এ তুই হাসলি কেন? দাঁড়া, বলেই বর্ণা হাসতে হাসতে তাকে ধরতে ছুটে যায়। সবাই হো-হো কওে হেসে ওঠে।
তারা কিছু খেয়ে পশুরামের প্রাসাদ ঘুরে মহাস্থানগড়ের সবচেয়ে মুখরোচক স্থান বেহুলার বাসরঘরের দিকে রওনা হয়। সম্রাট অশোক এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়। প্রায় ৪৫ ফুট উচ্চতার এ স্তম্ভে ২৪ কোণবিশিষ্ট চৌবাচ্চা সদৃশ একটি স্থাপনা রয়েছে, যা বেহুলার বাসরঘর নামেই পরিচিত।
চম্পাই নগরের ব্যবসায়ী চাঁদ সওদাগর না-কি মনসা দেবীর বরপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, যদি তিনি মনসাকে পূজা দেন, তাহলে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল এই ত্রিলোকে মনসার পূজা প্রচলিত হবে, অন্যথায় নয়। শিবভক্ত চাঁদ সওদাগর মনসা বিদ্বেষী হওয়ায় তা করতে রাজি ছিলেন না। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী সনকা গোপনে স্বামীর মঙ্গলের জন্য মনসা দেবীর পূজা করতেন। সওদাগর সাহেব তা জানতে পেরে ক্রুদ্ধ হয়ে পূজার সে ঘট লাথি মেরে ভেঙে দিলেন। এতে মনসা আরও ক্ষেপলেন এবং তাঁকে শায়েস্তা করার জন্য তাঁর ছয় পুত্রকে সর্প দংশনে মারলেন।
মনসা খোয়াবে সওদাগারকে প্রলোভন দিলেন। তিনি তাঁকে পূজা দিলে তাঁর পুত্রগণ আবার প্রাণ ফিরে পাবে। এতে সওদাগর সাহেব আরও ক্রোধান্বিত হলেন এবং মনসাকে আহত করলেন। এভাবেই মনসা ও সওদাগরের যুদ্ধ চলতে থাকার একপর্যায়ে চাঁদ সিংহল বাণিজ্য শেষ করে ফেরার পথে তাঁকে বিপদে ফেলতে কালিদাহ সাগরে মনসাদেবী অপ্রত্যাশিত ঝড় সৃষ্টি করেন, যাতে তিনি দেবীর বশ্যতা স্বীকার করে নেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না, সওদাগর হারবার পাত্র নন। সবগুলো জাহাজ পানিতে তলিয়ে গেলেও প্রাণে বেঁচে যান সওদাগর সাহেব। এদিকে পুত্র-শোকে মুহ্যমান তাঁর স্ত্রী পুত্রদের জীবন ফেরত পাওয়ার আশায় দেবী মনসার পূজা অব্যাহত রাখেন। এতে মনসা তাকে পুত্রবর দিলেন বটে, তবে সাথে শাপও দিলেন। সে সময়ে চাঁদ সওদাগরের এক পুত্র জন্ম হয়, যার নাম লখিন্দর। বাসরঘরে লখিন্দরকে সাপ কামড়াবে।
এটা মূলত মঙ্গলকাব্যের অংশবিশেষ, যা মনসা মঙ্গলকাব্যের অর্ন্তগত। লৌকিক, অলৌকি ও পৌরলৌকিকতা আশ্রিত ধর্মীয় গাম্ভীর্যের সংবেদনশীলতার সংমিশ্রণে এ মঙ্গলকাব্য সৃষ্ট। মনসা মঙ্গলকাব্যের অন্যতম কবি শ্রী নারায়ণ দেবের কাব্য ‘পদ্মাপুরাণ’-এর তৃতীয় খণ্ডে এই চাঁদ সওদাগর ও মনসাদেবীর উপাখ্যান বর্ণিত।
এখানে ঐতিহাসিক দুটি ঘটনা-প্রবাহে ধর্মকে এমনভাবে মেশানো হয়েছে যে, ইতিহাসের ঐতিহ্যও ধর্মের মোড়কে ঢাকা পড়ে হারিয়ে গেছে। দর্শনার্থীদের চঞ্চলা আবেগী ইন্দ্রিয়ের মোহনাতে যেন ঐতিহাসিক লৌকিকতাকে ছাপিয়ে ধর্মের অলৌকিকতার ছটা আছড়ে আছড়ে পড়ছে। তাদেরকে উদ্বেলিত করে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষ তার সভ্যতা নামক বটবৃক্ষের শিকড়ের গভীরতায় প্রোথিত নাড়ি-নুড়ির আকুল আবেদন নয়, যেন ধর্মীয় রসে-ভরা মধু পান করছে। কখনো মাছের পিঠে আবার কখনো বা নাগিনের ফোঁসে।
কীলাদেবীর ঘাটে এসে যেন সকল মানবঐতিহ্য ডুবেছে এবং বেহুলার বাসরঘরে তো ধর্মীয় রথের কেতন উড়েছে। এখানে জাতি হিসাবে আমাদের অপরিসীম হীনম্মন্যতা ও দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হয় বটে। আমাদের প্রাগৈতিহাসিক, রাজনৈতিক দর্শন ও মূল্যবোধ এই দুর্বল চিত্তের আঁতুরঘর। যা আমরা আজও লালন করে চলেছি।
সোজা বাংলায় একটি জাতির রাজনৈতিক দর্শন ও মূল্যবোধের উপরেই ঐ জাতির আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক বুনিয়াদ, মুক্তি, জীবনযাত্রা ও জীবনবোধের আমুল নির্ভশীলতা পরিলক্ষিত হয়। যার উপরে নির্ভর করে ঐ জাতির চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধ কতটা উঁচুতে উঠতে পারে তথা শক্তিশালী হতে পারে। এই জায়গাটিতে আমাদের এখনো আফসোস ছাড়া কিছুই নেই। ভবিষ্যতের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। এখানে রাজনৈতিক দর্শন অবশ্যই ধর্মীয় আবেশ মুক্ত এবং ব্যবসায়িক মুনাফা নির্মোহ মননে বিবেচিত হতে হবে। কেননা এদুটি উপাদানই রাজনৈতিক ক্রিয়ার সফলতার সহজ-সরল দুটি উপাদেয়, যা জনসাধারণকে দ্রুততার সাথে গিলতে প্রলুব্ধ করে।

Title: তৃতীয় পৃথিবীতে
Author: সালমান পারভেজ সবুজ
Publisher: রয়েল পাবলিকেশন

আরো পড়ুনঃ তৃতীয় পৃথিবীতে (পর্ব-০২)



সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আরও খবর...